‘দ্বিজেন শর্মা পরিবেশ পদক ২০২৫’ অর্জন করেছেন শেকৃবি অধ্যাপক ড. কাজী আহসান হাবীব
সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং এটি নিরূপণে ডিএনএ বারকোডিং ও ই-ডিএনএ এর ব্যবহার, সামুদ্রিক সংরক্ষণ জীববিজ্ঞান, উপকূলীয় প্রতিবেশ এবং ব্লু ইকোনমি নিয়ে নিরলস গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি সম্প্রতি ‘পরিবেশ কীর্তিমান’ ক্যাটাগরিতে ‘দ্বিজেন শর্মা পরিবেশ পদক ২০২৫’ অর্জন করেছেন। গত ১০ জুলাই বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিষারদ মিলনায়তনে ব্র্যাক ব্যাংক ও তরু পল্লব আয়োজিত পদক প্রদান অনুষ্ঠানে অধ্যাপক ড. কাজী আহসান হাবীব এর হাতে এই পদক তুলে দেন বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব আবদুল আউয়াল মিন্টু।
বাংলাদেশের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় প্রতিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিবেশ বিষয়ে গবেষণাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে তুলতে যাঁদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তাঁদের অন্যতম শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের ডিন ও ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী আহসান হাবীব। তার গবেষণার বড় অর্জনগুলোর একটি হলো বাংলাদেশের সামুদ্রিক মাছের হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ। প্রায় ৫০ বছরের বৈজ্ঞানিক গবেষণা, বই ও প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে তিনি ও তাঁর গবেষণা দল প্রমাণ করেন যে, দেশে পূর্বে স্বীকৃত ৪৭৫ প্রজাতির পরিবর্তে অন্তত ৭৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ রয়েছে। এই গবেষণা বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্পদ সম্পর্কে ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে এবং ভবিষ্যৎ গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রমের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের সমুদ্রাঞ্চল থেকে বিশ্বে নতুন তিনটি মাছের প্রজাতি আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়া সেন্টমার্টিনের প্রবাল প্রতিবেশ থেকে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমায় প্রথমবারের মতো ৩৭টি রিফ মাছ, ১২টি প্রবাল, ১০টি কাঁকড়া এবং একাধিক মোলাস্ক প্রজাতির নতুন রেকর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুন্দরবনের জলজ প্রতিবেশ থেকেও প্রথমবারের মতো পাঁচটি মাছের প্রজাতি নথিভুক্ত করেন তিনি। এসব গবেষণা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে এবং বাংলাদেশের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকে বৈশ্বিক গবেষণায় নতুনভাবে তুলে ধরেছে।
গবেষণাকে শুধু গবেষণাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ছাত্রছাত্রী, গবেষক ও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর উদ্যোগে দেশের সামুদ্রিক এবং স্বাদুপানির জীববৈচিত্র্য নিয়ে ‘Marine Biodiversity Portal of Bangladesh’ এবং ‘Freshwater Biodiversity Portal of Bangladesh’ নামক দুটি সমৃদ্ধ ডিজিটাল তথ্যভান্ডার ও অনলাইন পোর্টাল তৈরি করা হয়েছে। এসব পোর্টালে মাছ, প্রবাল, প্ল্যাঙ্কটন, কাঁকড়া, মোলাস্ক, সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ, পাখি, শৈবালসহ হাজারো জীবের ছবি, বৈজ্ঞানিক পরিচিতি, আবাসস্থল, বিস্তৃতি ও ডিএনএ বারকোড সংরক্ষিত রয়েছে। গবেষক, শিক্ষার্থী, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ মানুষের জন্য এগুলো বর্তমানে একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র হিসেবে কাজ করছে।
সেন্টমার্টিন দ্বীপে পরিবেশ সচেতনতা তৈরিতে তাঁর উদ্যোগ দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। সৈকতে পড়ে থাকা প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল এবং অন্যান্য বর্জ্য সংগ্রহ করে তাঁর পরিকল্পনায় নির্মিত হয় বিশালাকার মাছ, কচ্ছপ ও জেলিফিশের ম্যুরাল। এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেশের প্রায় সব জাতীয় গণমাধ্যমের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও প্রচারিত হয়। বিশেষ করে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন সেন্টমার্টিনে প্লাস্টিক দূষণের বিষয়টি বৈশ্বিকভাবে আলোচনায় নিয়ে আসে। পরিবেশবিদদের মতে, এই উদ্যোগ দ্বীপটিকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা (Marine Protected Area) হিসেবে ঘোষণার গুরুত্ব তুলে ধরতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি তিনি প্রায় প্রতিবছর শিক্ষার্থী ও তার গবেষণা দল নিয়ে সেন্টমার্টিনে সৈকত ও প্রবাল এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করে তরুণদের পরিবেশ সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করছেন।
বাংলাদেশে আধুনিক eDNA প্রযুক্তি ব্যবহার করে জলজ জীববৈচিত্র্য শনাক্তকরণ গবেষণাতেও তিনি পথিকৃৎদের একজন। ইউনেস্কোর উদ্যোগে সুন্দরবনে পরিচালিত আন্তর্জাতিক eDNA গবেষণায় তিনি বাংলাদেশের গবেষণা কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন। এই গবেষণার মাধ্যমে সরাসরি জলজ প্রাণী না ধরে পানির নমুনা সংগ্রহ করে এতে মিশে থাকা প্রাণীর ডিএনএ খন্ড আলাদা করে সকুয়েন্সিং বা মেটাবারকোডিং এর মাধ্যমে বিপন্ন মাছ, ডলফিনসহ অসংখ্য জলজ প্রাণীর উপস্থিতি অতি স্বল্প সময়ে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যা দেশের জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
এছাড়া সেন্টমার্টিন, সুন্দরবন এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে একাধিক গবেষণাভিত্তিক বই রচনা করেছেন, যা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স বই হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে তাঁর প্রায় ৭০টিরও অধিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে এবং তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেছেন। বাংলাদেশ ফিশারিজ রিসার্চ ফোরাম, ওশানোগ্রাফিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, জুওলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন।